আজকে আমরা আলোচনা করব আপনাদের মাঝে আবুল খায়ের গ্রুপ নিয়ে। আবুল খায়ের গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক বহুমুখী প্রতিষ্ঠান। এটি শিল্প, বাণিজ্য, উৎপাদন, ও সেবা খাতে ব্যাপক অবদান রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৩ সালে মরহুম এম. এ. হাশেম প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রুপটির সদর দপ্তর চট্টগ্রামে অবস্থিত।
Abul Khair Group কোন কোন শিল্প
- স্টিল: একেএস (Abul Khair Steel)
- সিমেন্ট: শাহ সিমেন্ট (Shah Cement)
- খাদ্যপণ্য: মার্কস মিল্ক (Marks Milk), সিলন চা (Ceylon Tea)
- সিরামিক: স্টেলা সিরামিকস (Stella Ceramics)
- তামাক: ব্র্যান্ডেড বিড়ি ও সিগারেট
- ভোগ্যপণ্য: জাহাজ মার্কা ভোজ্যতেল
মূল ব্যবসায়িক ক্ষেত্র:
১. স্টিল ও নির্মাণ সামগ্রী:
- আবুল খায়ের স্টিল মিলস লিমিটেড বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রড, স্টিল বার, ও নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদক।
- এছাড়া আবুল খায়ের রিফ্র্যাক্টরিজ লিমিটেড আগুনরোধী ইট ও শিল্প উপকরণ তৈরি করে।
২. ভোক্তা পণ্য:
- আবুল খায়ের কনজিউমার প্রোডাক্টস বিভাগে গমের আটা, ভোজ্যতেল, মসলা, বিস্কুট, ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদিত হয়।
- “ফ্রেস” ও “গ্র্যান্ড” ব্র্যান্ডের পণ্য দেশজুড়ে জনপ্রিয়।
৩. সিমেন্ট ও শিল্প রাসায়নিক:
- সিমেন্ট উৎপাদন ও সরবরাহে গ্রুপের উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব রয়েছে।
৪. অন্যান্য ক্ষেত্র:
- কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট, ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও গ্রুপটি সক্রিয়।
উল্লেখযোগ্য সহায়ক প্রতিষ্ঠান:
- আবুল খায়ের স্টিল মিলস লিমিটেড
- আবুল খায়ের এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ
- আবুল খায়ের ফুডস লিমিটেড
- আবুল খায়ের ফার্টিলাইজার কোম্পানি
সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR):
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গ্রুপটি নিয়মিত কাজ করে।
- চট্টগ্রামে স্কুল, কলেজ, ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
অর্থনৈতিক অবদান:
- দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ও রপ্তানি আয়ে গ্রুপটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
- বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে স্টিল ও ভোক্তা পণ্য রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বীকৃতি:
- বাংলাদেশের শীর্ষ করদাতা ও শিল্প পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।
বর্তমান অবস্থা:
গ্রুপটি বর্তমানে এম. এ. হাশেমের উত্তরসূরিদের নেতৃত্বে দেশ-বিদেশে তার কার্যক্রম সম্প্রসারিত করছে। শিল্পখাতে উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নে তাদের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে।
আবুল খায়ের গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় বিড়ি ব্যবসার মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়েরের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে স্টিল, সিমেন্ট, সিরামিকস, খাদ্যদ্রব্য এবং তামাকজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও বিকাশ:
১৯৪৬ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে এসে আবুল খায়ের পাহাড়তলী বাজারে একটি মুদি দোকানে চাকরি নেন। পরে নিজেই সেখানে দোকান দেন এবং এক পর্যায়ে ওই এলাকায় বিড়ির কারখানা স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে সেই কারখানা ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লায় সম্প্রসারণ করেন। এরপর তিনি ‘শিশমহল’ লুঙ্গি তৈরির কারখানা, ইটভাটা এবং সিনেমা হলসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানরা প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন।
বর্তমান কার্যক্রম: বর্তমানে, আবুল খায়ের গ্রুপের সদর দপ্তর চট্টগ্রামে অবস্থিত এবং তারা বিভিন্ন খাতে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাদের স্টিল ব্র্যান্ড “একেএস” (Abul Khair Steel) ইস্পাত শিল্পে শীর্ষস্থানীয়, এবং সিমেন্ট খাতে “শাহ সিমেন্ট” ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এছাড়া, “গরু মার্কা ঢেউটিন” ঢেউটিনের বাজারে শীর্ষে রয়েছে, এবং “স্টেলা” ব্র্যান্ডের স্যানিটারি পণ্য দ্রুততম সময়ে শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে। খাদ্যপণ্যে “মার্কস” ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধ এবং “সিলন” চা বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রেখেছে।
ভোগ্যপণ্য খাতে সম্প্রসারণ: সম্প্রতি, আবুল খায়ের গ্রুপ ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, বিশেষ করে ভোজ্যতেল খাতে “জাহাজ মার্কা” ব্র্যান্ডের স্টারশিপ সয়াবিন তেল বাজারজাত করার মাধ্যমে।
রাজস্ব অবদান:
আবুল খায়ের গ্রুপ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তারা এক বছরে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব প্রদান করেছে, যা তাদের দেশের শীর্ষ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্থান দিয়েছে।
কর্মসংস্থান ও নিয়োগ:
প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, যা তাদের ক্রমবর্ধমান কার্যক্রমের প্রমাণ। সম্প্রতি, তারা ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং অফিসার’ পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, যেখানে ২৪,০০০ থেকে ২৮,০০০ টাকা বেতন প্রদান করা হবে এবং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন নেই।
সামাজিক দায়বদ্ধতা:
আবুল খায়ের গ্রুপ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে নিয়োজিত, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে। তারা বিভিন্ন সময়ে সমাজের দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সহায়তায় অবদান রেখেছে।
আবুল খায়ের গ্রুপের সাফল্যের পেছনে তাদের প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়েরের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর উত্তরসূরিরা তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপে পরিণত করেছেন।
আবুল খায়ের গ্রুপ কোন কোন শিল্প নিয়ে কাজ করে
আবুল খায়ের গ্রুপ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ কনগ্লোমারেট, যা বিভিন্ন শিল্পখাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের মূল ব্যবসার ক্ষেত্রগুলো হলো:
১. ইস্পাত শিল্প
আবুল খায়ের গ্রুপ বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পে বিপ্লব এনেছে। তাদের উৎপাদিত স্টিল আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং টেকসই।
একেএস:
- বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ স্টিল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
- রড, গ্যালভানাইজড শীট (ঢেউটিন), স্টিল পাইপসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী তৈরি করে।
- বাংলাদেশের অনেক বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে এই স্টিল ব্যবহার করা হয়।
ঢেউটিন:
- দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঢেউটিন ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম।
- আবহাওয়া সহনশীল ও দীর্ঘস্থায়ী।
স্টিল পাইপ ও কাঠামোগত ইস্পাত পণ্য:
- বিল্ডিং, ব্রিজ, ফ্যাক্টরি ও অন্যান্য স্থাপনার জন্য স্টিল পাইপ ও কাঠামোগত পণ্য সরবরাহ করে।
২. সিমেন্ট শিল্প
শাহ সিমেন্ট (Shah Cement):
- এটি দেশের বৃহত্তম সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
- উচ্চমানের পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট উৎপাদন ও বাজারজাত করে।
- নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
- বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিশ্বের বৃহত্তম ভিকাট সিমেন্ট মিল স্থাপন করেছে।
৩. সিরামিক শিল্প
বাংলাদেশের আধুনিক গৃহস্থালী এবং বাণিজ্যিক নির্মাণে সিরামিকের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্টেলা সিরামিকস (Stella Ceramics):
- আধুনিক ডিজাইনের টাইলস ও সিরামিক পণ্য উৎপাদন করে।
- উচ্চমানের ফ্লোর ও ওয়াল টাইলস সরবরাহ করে।
- আবাসিক ও বাণিজ্যিক নির্মাণে ব্যাপক ব্যবহৃত হয়।
৪. খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য শিল্প (Food & Consumer Goods Industry)
আবুল খায়ের গ্রুপের খাদ্যপণ্য ব্যবসা বাংলাদেশের বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য:
- মার্কস (Marks Milk) – গুঁড়া দুধ ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য বিখ্যাত।
- ডেইরি মিল্ক (Dairy Milk) – তরল দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করে।
চা শিল্প:
- সিলন টি (Ceylon Tea) – এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় চা ব্র্যান্ড।
- উচ্চমানের চা পাতা ব্যবহার করে উন্নতমানের চা উৎপাদন করা হয়।
ভোজ্যতেল:
- জাহাজ মার্কা তেল (Jahaj Marka Oil) – খাঁটি সরিষার তেল ও সয়াবিন তেল সরবরাহ করে।
পানীয়:
- কোমল পানীয় ও দুগ্ধজাত পানীয় তৈরি ও বাজারজাতকরণ করে।
৫. তামাক শিল্প
আবুল খায়ের গ্রুপের তামাক খাত দেশের অন্যতম পুরনো ও বৃহৎ শিল্প।
বিড়ি ও সিগারেট উৎপাদন:
- উচ্চমানের বিড়ি ও সিগারেট তৈরি ও বাজারজাত করে।
- সাশ্রয়ী মূল্যের জন্য বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়।
৬. কাগজ ও টিস্যু শিল্প
আবুল খায়ের গ্রুপ কাগজ ও টিস্যু উৎপাদনেও অবদান রাখছে।
কাগজ:
- বিভিন্ন ধরনের অফিস, একাডেমিক ও প্রিন্টিং কাগজ তৈরি করে।
- উন্নতমানের প্যাকেজিং কাগজ সরবরাহ করে।
টিস্যু পণ্য:
- নরম ও উন্নতমানের টিস্যু পণ্য সরবরাহ করে।
- হাইজিনিক ন্যাপকিন ও ফেসিয়াল টিস্যু তৈরি করে।
৭. গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প
আবুল খায়ের গ্রুপের টেক্সটাইল বিভাগ রপ্তানি খাতেও অবদান রাখছে।
ফ্যাশন ও টেক্সটাইল:
- উন্নতমানের কাপড় ও পোশাক উৎপাদন করে।
- দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR)
আবুল খায়ের গ্রুপ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেমন:
- শিক্ষা ও বৃত্তি কর্মসূচি
- স্বাস্থ্যসেবা ও হাসপাতাল
- দরিদ্রদের জন্য খাদ্য ও সহায়তা কর্মসূচি
- পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রম
আবুল খায়ের গ্রুপ এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
- আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ
- আরও অত্যাধুনিক কারখানা স্থাপন
- নির্মাণ শিল্পের জন্য উন্নতমানের স্টিল ও সিমেন্ট সরবরাহ বৃদ্ধি
- খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান।
- বার্ষিক কর প্রদান করে দেশের শীর্ষ করদাতাদের মধ্যে একটি।
- বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখছে।
- বহু মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করছে।
Know More:
- বাংলাদেশ ব্যাংক | Bangladesh Bank
- Akij Biri Factory Limited | আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য
- City Bank FDR | সিটি ব্যাংক এফ ডি আর
FAQ
১. আবুল খায়ের গ্রুপ এর প্রধান কার্যালয় কোথায়?
এর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে অবস্থিত, তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের কারখানা ও অফিস রয়েছে।
২. আবুল খায়ের গ্রুপ কী?
আবুল খায়ের গ্রুপ (Abul Khair Group) বাংলাদেশে অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান, যা বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে, যেমন স্টিল, সিমেন্ট, সিরামিক, খাদ্যপণ্য, তামাক, ও ভোগ্যপণ্য।
৩. আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা কে?
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়ের, যিনি ১৯৫৩ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে বিড়ির ব্যবসার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন।